গবাদি পশুর সুষম খাদ্য (Balanced Feed for Livestock)
সুষম খাদ্য : যে সকল খাদ্যে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত খাদ্য উপাদানগুলো আনুপাতিক হারে বিদ্যমান থাকে তাকে সুষম খাদ্য বলে। আমাদের দেশে গবাদি পশুর ক্ষেত্রে সুষম খাদ্যের চাহিদা খুবই বেশি। কারণ এদেশের গবাদি পশুকে প্রধানত বিচালি বা ঘাস খাইয়ে পালা হয়। এতে করে সবগুলো খাদ্য উপাদানের চাহিদা মোটেই পূরণ হয় না।
গবাদি পশুর সুষম খাদ্যের গুরুত্ব (Importance of Balanced Feed)
গবাদি পশুর জন্য সুষম খাদ্যের গুরুত্বগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো :
- ১. সুষম খাদ্য খাওয়ালে পশুর মাংস ও দুধ উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
- ২. এ খাদ্যের অভাবে পশু পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং ক্রমশ দুর্বল ও অকর্মণ্য হয়ে পড়ে।
- ৩.পশুর অপুষ্টিজনিত এবং অন্যান্য রোগ কম হয়।
- ৪.অল্প জায়গায় অধিক ঘনত্বে গবাদি পশু পালন সম্ভব হয়।
- ৫.পশুর বাঁচার হার বৃদ্ধি পায় এবং মৃত্যুর হার হ্রাস পায়।
গবাদি পশুর সুষম খাদ্য তৈরির নিয়মাবলি (Preparation Method of Balanced feed)
গবাদি পশুর সুষম খাদ্য উপকরণগুলো সাধারণত তিন প্রকার। যথা—
(১) আঁশযুক্ত খাদ্য (Roughage Feed): শুষ্ক অবস্থায় যেসব খাদ্যে ১৮% এর চেয়ে বেশি আঁশ এবং ৬০% এর কম সামগ্রিক পরিপাচ্য পুষ্টি (TDN) থাকে, সেই খাদ্যকে আঁশজাতীয় খাদ্য বলে। যেমন: ধান ও গমের বিচালী, খেসারি, মাষকলাই ইত্যাদির ভুষি, কাঁচাঘাস, লতাপাতা, সাইলেজ, হে ইত্যাদি। প্রাণীদের জীবনধারণ, বৃদ্ধি ও উৎপাদনের জন্য এ জাতীয় খাদ্য বিশেষ প্রয়োজন। এসব আঁশজাতীয় খাদ্য মেশিনে ছোট ছোট করে কেটে ব্যবহার করতে হবে।
(২) দানাদার খাদ্য (Cereal Feed): যেসব খাদ্যে আয়তনের তুলনায় খাদ্যমান অপেক্ষাকৃত বেশি এবং সহজপাচ্য তাকে দানাদার খাদ্য বলে। যেমন : শস্যদানা, গমের ভুষি, চালের কুঁড়া, খৈল, হাড়ের গুঁড়া, শুঁটকির গুঁড়া ইত্যাদি। দানাদার খাদ্য ছোট ছোট করে কাটা আঁশজাতীয় গো খাদ্যের সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়।
(৩) সহকারী বা বিশেষ খাদ্য (Feed Additives): ঝিনুকচূর্ণ, বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও খনিজ লবণ, ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক ইত্যাদি। সহকারী খাদ্য পরিমাণে কম লাগলেও পশুর পুষ্টি বাড়াতে এসব খাদ্য বিশেষ প্রয়োজন।
গবাদি পশুর সুষম খাদ্য উপকরণগুলোর তৈরির নিয়মাবলি নিচে আলোচনা করা হলো :
- শুকনা খড় (Straw): বড় আকারের একটি দেশি গরুর দৈনিক খড়ের চাহিদা ৩ থেকে ৪ কেজি।
- কাঁচা ঘাস (Green Fodder): প্রতিটি দেশি গরুর জন্য দৈনিক ৯ থেকে ১২ কেজি এবং বিদেশি উন্নত জাতের গরুর জন্য ১৩ থেকে ১৫ কেজি কাঁচা ঘাস প্রয়োজন।
- সাইলেজ ও ‘হে’ (Silage): উন্নতমানের কাঁচা ঘাস যেমন ভুট্টা, নেপিয়ার, জার্মান ইত্যাদি দ্বারা সাইলেজ ও হে তৈরি করে কাঁচা ঘাসের অভাবের সময় পশুকে খাওয়ানো যায়।
- দানাদার খাদ্য (Cereal Feed): খড় ও কাঁচা ঘাসের পাশাপাশি পুষ্টিকর দানাজাতীয় খাদ্য পশুর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
গবাদি পশুর ১০০ কেজি ওজনের দানাদার খাদ্য তৈরির উপকরণ ও পরিমাণের একটি ছক:
| খাদ্য উপকরণ | পরিমাণ (কেজি) |
|---|---|
| (১) গমের ভুষি | ৫০ |
| (২) চালের কুঁড়া | ২০ |
| (৩) খেসারি ভাঙা | ১৮ |
| (৪) তিল/বাদামের খৈল | ১০ |
| (৫) লবণ | ১ |
| (৬) খনিজ মিশ্রণ | ১ |
| মোট = | ১০০ কেজি |
উৎস: প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
![]() |
| গবাদিপশুর দানাদার খাদ্য |
দানাদার খাদ্য খাওয়ানোর নিয়ম
উপরিউক্ত দানাদার মিশ্রণ থেকে বিভিন্ন বয়সের পশুতে নিম্নলিখিত হারে খাওয়ানো হয় :
- ক. বাছুর : দৈনিক আধাকেজি থেকে এক কেজি (বয়স অনুপাতে)।
- খ. দেশি গাভী : দৈনিক দেড় কেজি থেকে তিন কেজি।
- গ. উন্নতজাতের গাভী : দৈনিক তিন থেকে ছয় কেজি। এছাড়া প্রতি ৩ কেজি অতিরিক্ত দুধ পেতে হলে অতিরিক্ত আধাকেজি দানাদার খাদ্য খাওয়াতে হবে।
- ঘ. দুগ্ধহীন গাভী : দুধ প্রদান বন্ধ অবস্থায় দৈনিক দেড় থেকে দুই কেজি।
- ঙ. বলদ বা ষাঁড় : প্রাপ্তবয়স্ক ও কর্মক্ষম বলদকে দৈনিক ৩ থেকে ৪ কেজি দানাদার খাদ্য খাওয়াতে হয়।
গাভীর খাদ্য / Feed for Cow
গাভীর দুধ উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে রাখতে হলে তাকে সুষম ও সঠিক পরিমাণে খাদ্য প্রদান অত্যাবশ্যক। সাধারণত দুগ্ধালো গাভীর প্রতি ১০০ কেজি ওজনের জন্য ২ কেজি খড় সরবরাহ করতে হয়। ১ কেজি খড় ৩ কেজি তাজা সবুজ ঘাসের সমতুল্য। গাভীকে প্রতি ১০০ কেজি ওজনের জন্য ১ কেজি শুকনো আঁশযুক্ত খাদ্য (খড়) এবং ৩ কেজি তাজা সবুজ আঁশযুক্ত খাদ্য (ঘাস) দেওয়া প্রয়োজন। এ হিসাবে ৫০০ কেজি ওজনের একটি দুগ্ধবতী গাভীকে ৫ কেজি শুকনো খড় এবং ১৫ কেজি সবুজ ঘাস সরবরাহ করতে হবে। দানাদার খাদ্য সরবরাহের ওপর গাভীর দুধ উৎপাদন পরিমাণ নির্ভরশীল।
২৫০-৩০০ কেজি দৈহিক ওজনের একটি দুগ্ধবতী গাভীর জন্য সুষম খাদ্য তালিকা নিম্নরূপ :
| খাদ্য উপকরণের নাম | দৈনিক প্রদানের পরিমাণ |
|---|---|
| ১. কাঁচা সবুজ ঘাস | ৯ - ১২ কেজি |
| ২. শুকনো খড় | ৩ - ৪ কেজি |
| ৩. দানাদার খাদ্য মিশ্রণ | ৪ - ৭ কেজি |
| ৪. পরিষ্কার বিশুদ্ধ পানি | পর্যাপ্ত পরিমাণে |

Post a Comment